স্বাস্থ্য

ডায়াবেটিস রোগীর নিষিদ্ধ খাবার তালিকা – razuaman.com

ডায়াবেটিস রোগীর নিষিদ্ধ খাবার তালিকা – razuaman.co🐶

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘ স্থায়ী রোগ যা সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু ডায়াবেটিস একটি অসংক্রামক রোগ। এখন পর্যন্ত এই রোগটি অনিরাময়যোগ্য কিন্তু নিয়ন্ত্রণ যোগ্য। অর্থাৎ ডায়াবেটিস সনাক্ত হওয়ার পর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে  যেতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদরোগ, কিডনি রোগ,অন্ধত্ব এবং অন্যান্য জটিলতর সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রন করতে হবে। আর রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে হলে কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, সেগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। আজ আমরা সেই সকল খাদ্যগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যাক্তির জন্য শর্করা জাতীয় খাবারের প্রভাব

শর্করা,আমিষ ও চর্বি হলো এক ধরনের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, যা আমাদের দেহে শক্তি সরবরাহ করে। আবার শর্করার তিনটি উপাদান রয়েছে স্টার্চ,চিনি ও ফাইবার। কিন্তু ফাইবার হজম হয় না কিন্তু অপর দুটি উপাদান হজম হয় এবং শরীর শোষণ করে নেয়। যদি ১০ গ্রাম  শাকসবজিতে ৬ ভাগ শর্করা ও ৪ ভাগ ফাইবার থাকে তাহলে মোট শর্করার পরিমাণ ৬ গ্রাম বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যাক্তি যখন অতিরিক্ত মাত্রায় শর্করা জাতীয় খাবার গুলো খাবে তাহলে তার রক্তে শর্করার পরিমাণ বিপদজনকভাবে উচ্চমাত্রায় বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাহলে, এই কথা স্পষ্ট যে রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে হলে শর্করা জাতীয় খাবারগুলো কমকরে খেতে হবে। তাহলে আসুন জেনে নেয়া যাক কিছু খাবার সম্পর্কে যেগুলো ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তরল বা মিষ্টি পানীয়

মিষ্টি স্বাদযুক্ত পানীয়গুলোতে ফ্রুক্টোজের পরিমান খুব বেশি থাকে। এই উচ্চমাত্রার ফ্রুক্টোজ যুক্ত পানীয় ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ফ্যাটিলিভার ডিজিজের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এই মিষ্টি পানীয় গ্রহন করলে, পেটের চর্বি বা মেদ, ক্ষতিকর রক্ত চর্বি টাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যায় ফলে বিভিন্ন হৃদরোগের ঝুঁকি এবং হাইপারটেনশনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

এক কথায়, মিষ্টি পানীয় গ্রহন করলে একজন ডায়াবেটিস রোগীর ইনসুলিন প্রতিরোধ ও রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাবে। রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে হলে একজন ডায়াবেটিস রোগীকে অবশ্যই এধরণের পানীয় বর্জন করতে হবে।

এধরনের পানীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে চিনির শরবত, আখের রস, কোমল পানীয় ইত্যাদি।

 কৃতিম ট্রান্স ফ্যাট

কৃত্রিম ট্রান্স ফ্যাটগুলি চরম অস্বস্থ্যকর খাবারগুলোর মধ্যে একটি। এখাবারগুলিকে স্থিতিশীল করার জন্য হাইড্রোজেন যুক্ত করে বানানো হয়। যদিও এই খাবারগুলো সরাসরি রক্তে  শর্করার পরিমাণ বাড়ায় না কিন্তু এগুলো ইনসুলিন প্রতিরোধ করে এবং পেটের মেদ-চর্বি বাড়িয়ে দেয়। বেশির ভাগ দেশে এ খাবারগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

একথা স্পষ্ট যে কৃত্রিম ট্রান্স ফ্যাট যুক্ত খাবারগুলি ইনসুলিন প্রতিরোধ করে ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য অত্যন্ত বিপদজনক।

তাই একজন ডায়াবেটিস রোগীকে অবশ্যই এই ধরনের খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে।

সাদা রুটি বা ভাত

আমাদের দেশে প্রচলিত একটা নিয়ম রয়েছে ডায়াবেটিস হলে দুইবেলা রুটি আর একবেলা ভাত খেতে হবে। মেনে নিলাম কিন্তু আমরা যে সাদা রুটি আর সাদা ভাত খাই তাতে কতটুকু শর্করা আছে তা কি আমরা জানি। এই প্রক্রিয়াজাত ভাত বা আটাতে খুব অল্পপরিমাণে ফাইবার থাকে এবং খুব বেশি শর্করা থাকে যা একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একথা স্পষ্ট যে, একজন ডায়াবেটিস রোগীকে তার রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে সাদা রুটি বা ভাতের পরিবর্তে লাল চালের ভাত এবং লাল আটার রুটি খেতে হবে।

চিনি বা মিষ্টি ফল দিয়ে বানানো দই

সাধারণ বা টক দই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী কিন্তু চিনি বা মিষ্টি ফলের রস দিয়ে বানানো দই একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ঝুঁকি হতে পারে। কেননা এই দইয়ে সাধারণত ফ্যাট কম থাকলেও চিনির পরিমাণ বেশি থাকে ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই একজন ডায়াবেটিস রোগীকে এই ধরনের দই বর্জন করতে হবে।

পরিবর্তে টক দই খাওয়ার যেতে পারে যা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

চা বা কফি

কফি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী এবং ডায়াবেটিস কমাতে সাহায্য করে কিন্তু মিষ্টি কফি বা চিনি দিয়ে বানানো কফি ডায়াবেটিস বাড়িয়ে তুলে। এই ধরনের কফি রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীকে এই ধরনের কফি বর্জন করতে হবে পরিবর্তে চিনিমুক্ত কফি খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

মধু ও আঁখের রস

মধু ও আঁখের রস প্রাকৃতিক উপাদান হলেও ডায়াবেটিস রোগীকে এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। সাদা চিনির মতো প্রক্রিয়াজাত না হলেও এগুলোতে প্রচুর পরিমানে কার্বস রয়েছে যা রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয়। রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য তালিকায়  এ ধরনের খাবার তালিকাভুক্ত করা যাবে না।

শুকনো ফল

ফল ভিটামিন সি ও পটাসিয়ামসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন এবং বিভিন্ন খনিজ লবণের একটি উৎস। দুর্ভাগ্যক্রমে শুকনো ফলে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়। যেমন একটি শুকনো কিসমিসে আঙুরের চেয়ে চারগুন গ্লুকোজ থাকে।

তাই একজন ডায়াবেটিস রোগীকে শুকনো ফলের পরিবর্তে তাজা ফল স্বল্পপরিমানে দেয়া যেতে পারে।

বাজারজাত করা স্ন্যাকস

প্যাকেট করা স্ন্যাকস বা হালকা খাবারগুলো  সাধারণত উচ্চ পরিশোধিত ময়দা থেকে তৈরি যেগুলোতে ফাইবার খুব কম থাকে এবং শর্করা বেশি থাকে। এই প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলি রক্তে গ্লুকোজ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

ফলের রস

ফলের রসে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন ও খনিজ লবন রয়েছে, কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি উচ্চ মাত্রায় ফ্রুক্টোজও রয়েছে। এই ফ্রুক্টোজ ইনসুলিন প্রতিরোধে সাহায্য করে ফলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায় অর্থাৎ ডায়াবেটিস বেড়ে যায়।

সারসংক্ষেপ

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘ স্থায়ী রোগ। এই রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে শর্করা জাতীয় খাবার গুলো পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে।

নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের একমাত্র উপায়।

ডায়াবেটিস রোগীর সকালের নাস্তা

সকালের নাস্তায় ফল থাকাটা খুব জরুরী। ফল শরীরে ক্যালরির অভাব পূরণ করে কোন ক্ষতি ছাড়াই। কলা, আপেল, কমলা, মাল্টা, স্ট্রবেরি এসব ফল স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারি।

টক দই

নাস্তায় টকদই অথবা চিনি ছাড়া ফ্যাট ফ্রি ঘরে পাতা দই যোগ করতে পারেন। এটি হজমশক্তি বৃদ্ধি করে এবং শরীরে ক্যালসিয়াম এর অভাব পূরণ করে।

ডিম এবং সুগার ফ্রি ব্রাউনব্রেড

টমেটো, পেঁয়াজ দিয়ে একটি ডিম অলিভ অয়েল এ ভেজে নিন। সাথে নিতে পারেন ফ্যাট ফ্রি চিজ এবং সুগার ফ্রি ব্রাউনব্রেড।

মিক্সড ব্রেকফাস্ট

ফ্যাট ফ্রি টকদই, মিক্সড ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম, ওয়াল নাটস, কর্ণফ্লেক্স মিক্সড করে খেয়ে নিতে পারে। এটা পুষ্টিকর এবং উপকারি।

ওটসমিল

রান্না করা ওটসমিল, বাদাম, সিনামন আর মিষ্টির জন্য চিনির বদলে অন্য কিছু মিলিয়ে মিক্সচার তৈরি করে নিন। এরপর লো ফ্যাট দুধের সাথে এটি খেয়ে নিতে পারেন।

কর্ণফ্লেক্স এবং ক্রিম চিজ খুব তাড়াহুড়ো থাকলে কর্ণফ্লেক্স এর সাথে লাইট ক্রিম চিজ মিলিয়ে দুধের সাথে খেয়ে নিতে পারেন। চটপট নাস্তাও হয়ে যাবে সাথে ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

সকালের নাস্তা (সকাল ৭.৩০ – ৮ টা)

রুটি (১ সারভিং)১ টা গমের আটার রুটি (মিডিয়াম)দুধ (১ সারভিং)১ গ্লাস ফ্যাট ছাড়া দুধ বা স্কিম মিল্কডিম (১ সারভিং)১ টা মুরগী অথবা হাঁসের ডিম (সিদ্ধ অথবা ভাঁজি)শাক সবজি (১ সারভিং)১ কাপ পাতা যুক্ত শাক বা ১/২ কাপ সবজি

ডায়াবেটিস রোগীর দুপুরের খাবার

স্যালাদ: বিভিন্ন ধরণের সবজি যেমন শসা, টমেটো, লেটুস পাতা, পার্সলে পাতা, গাজর সব মিলিয়ে একটি স্যালাদ অবশ্যই প্রতিদিনের খাবার তালিকায় রাখতে হবে।

মাছ বা মাংস: এক টুকরো মাছ অথবা মাংস খাবার তালিকায় রাখবেন। কিন্তু রেড মিট একেবারেই খাবেন না। মুরগির এক বা দুই পিস এবং যেকোন মাছ থাকতে পারে। ভাত খাওয়া উচিত নয়। আর খেলেও মেপে এক কাপ এর বেশি না।

ফল: হালকা কিছু ফল খাবার পর খেতে পারেন। এতে শরীর সতেজ থাকবে।

শাক-সবজি ও ডাল খাবার তালিকায় বিভিন্ন রকমের ডাল এবং সবজি রাখতে হবে। তবে খুব বেশি ঝাল মশলা দিয়ে না। দুপুরের খাবারে লাল শাক, পালং শাক,পুঁই শাক ইত্যাদি নানা ধরণের শাক থাকতে পারে।

দুপুরের খাবার (দুপুর ১.৩০ – ২ টা)

ভাত (৩ সারভিং)দেড় কাপ ভাতমাছ অথবা মাংস (২ সারভিং)৬০ গ্রাম পরিমাণ রান্না করা মাছ বা মাংস (ফ্যাট ছাড়া)শাক সবজি (৪ সারভিং)১ কাপ পাতা যুক্ত শাক খাকবে অবশ্যই, বাকী দেড় কাপ অন্যান্য সবজিডাল (১ সারভিং)১ কাপ মাঝারি ঘন ডাল

ডায়াবেটিস রোগীর বিকেলের নাস্তা

ডায়াবেটিস রোগীদের কিছুক্ষণ পর পরই হালকা কিছু নাস্তা করা উচিত। যেমন, চিনি ছাড়া বিস্কিট, ব্রেড,মুড়ি ইত্যাদি। বিকেলের নাস্তায় তাই হালকা কিছু খাবার রাখা যেতে পারে।

চা: গ্রিন টি অথবা মশলা চা চিনি ছাড়া খেতে পারেন। সাথে বিস্কিট, মুড়ি বা টোস্ট।

হালুয়া: ক্যাল ফ্রি দিয়ে গাজর বা সুজির হালুয়া খেতে পারেন। বুটের হালুয়াও বেশ স্বাস্থ্যকর।

শরবত ঘরে বিভিন্ন ফলের শরবত চিনি ছাড়া বানিয়ে নিন।

বিকেলের নাস্তা ( বিকেল ৫.৩০ – ৬ টা)

সিজনাল ফল (১ সারভিং)পছন্দমত ১ সারভিং সিজনাল ফলবাদাম, বুট এবং কলাই জাতীয় খাদ্য (১ সারভিং)১/৪ কাপ বাদাম বা বুট বা কলাই জাতীয় খাদ্য

ডায়াবেটিস রোগীর রাতের খাবার

রাতের খাবার চালের অথবা আটার রুটি

রাতে ভাত খাওয়াটা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য একেবারেই উচিত না। তাই চাল, গম অথবা আটার পাতলা ৩টি থেকে ৪টি রুটিই রাতের জন্য যথেষ্ট।

সবজি

রাতে রুটির সাথে হালকা সবজি খাওয়া যেতে পারে। পেটে গ্যাসের সমস্যা হলে ফল খাওয়ার দরকার নেই। মাছ রাতে মাংস না খাওয়াই ভাল। এক পিস মাছ খাওয়া যেতে পারে।

নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পানি পান করতে হবে, প্রতিদিন হাঁটতে যেতে হবে। কিছু হালকা ব্যায়ামের সাথে ওষুধ এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।

রাতের খাবার (রাত ৯ টা – ৯.৩০)

রুটি অথবা ভাত (১ সারভিং)১/২ কাপ ভাত অথবা ১ টা আটার রুটিমাছ অথবা মাংস (২ সারভিং)৬০ গ্রাম পরিমাণ রান্না করা মাছ বা মাংস (ফ্যাট ছাড়া)শাক সবজি (২ সারভিং)১ কাপ পাতা যুক্ত শাক খাকবে অবশ্যই, বাকী আধা কাপ অন্যান্য সবজিসিজনাল ফল (১ সারভিং)১ সারভিং সিজনাল ফল

Leave a Reply

Your email address will not be published.