স্বাস্থ্য

ডায়াবেটিস এড়াতে যেসব ফল কম খাবেন razuaman 2022

নানা ধরনের অসুখ ডেকে আনার জন্য ডায়াবেটিস যথেষ্ট। রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে দেখা দিতে পারে লিভার, কিডনি, চোখের সমস্যাসহ আরও অনেক রোগ। তাই রক্তে শর্করা বা সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, আমাদের খাবারের ধরন বা অভ্যাসে যদি বড় রকমের পরিবর্তন আসে, তবে বাড়তে পারে রক্তে সুগারের মাত্রা।

যাদের রাত জাগার অভ্যাস কিংবা দিনের বেলায় ঘুমান, তাদের রক্তেও সুগারের পরিমাণ বাড়তে পারে। আমরা প্রতিদিন যেসব ফল খাই সেগুলো বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, পানি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও একাধিক পুষ্টিগুণে ভরা। এসব ফলে থাকে প্রাকৃতিক শর্করা, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে যাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি বা ডায়াবেটিস আছে তাদের ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেসব ফলে শর্করা বেশি আছে, সেসব কম খাওয়াই তাদের জন্য ভালো। জেনে নিন কোন ফলগুলোতে শর্করা বেশি থাকে-

আম

আমের গন্ধ ও স্বাদ- দুটোই অনন্য। মিষ্টি স্বাদের এই ফল ছোট-বড় সবার কাছেই অনেক পছন্দের। তবে আমে শর্করার পরিমাণ একটু বেশিই থাকে। একটি মাঝারি মাপের আমে থাকে ৪৫ গ্রাম চিনি। যদি আপনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকেন বা ওজন কমাতে চান তবে আম কম খাওয়াই ‍উত্তম। প্রতিদিন কতটুকু আম খেতে পারবেন, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিলে বেশি ভালো।

আঙুর

আঙুর দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন সুস্বাদু। তবে এই ফলে শর্করার পরিমাণ থাকে বেশি। এককাপ আঙুরে থাকে প্রায় ২৩ গ্রাম চিনি। তাই বলে ডায়াবেটিস রোগীদের আঙুর একেবারে বাদ দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিন অল্প করে আঙুর খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও স্মুদি, শেক ইত্যাদিতে ব্যবহার করা যায়।

চেরি

মিষ্টি ফল চেরি। ভিনদেশি ফল হলেও এটি আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। তবে এতে শর্করার পরিমাণ থাকে বেশি। এককাপ চেরিতে প্রায় ১৮ গ্রাম চিনি থাকে। তাই ওজন কমাতে চাইলে বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে চেরি ফল থেকে দূরে থাকাই ভালো।

নাশপাতি

নাশপাতি অনেকের কাছে প্রিয় একটি ফল। এটি নানাভাবে আমাদের জন্য উপকার করে থাকে। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীর জন্য এটি বিশেষ উপকারী নয়। কারণ একটি মাঝারি মাপের নাশপাতিতে পাওয়া যায় ১৭ গ্রাম চিনি। তাই এই ফল খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়তে পারে। তবে দই কিংবা সালাদের সঙ্গে দুই-এক টুকরা নাশপাতি খেলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।

কলা

কলাকে বলা হয় এনার্জির পাওয়ার হাউস। কারণ এই ফল খেলে দ্রুত শক্তি বাড়ে। এটি আমাদের শরীরে আরও অনেক পুষ্টির পৌঁছে দেয়। তবে এটিও ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উপকারী নয়। কারণ একটি মাঝারি মাপের কলায় থাকে ১৪ গ্রাম চিনি। তাই ডায়াবেটিসের রোগীর জন্য কলা কম খাওয়াই ভালো। তবে সকালের নাস্তায় পিনাট বাটারের সঙ্গে কয়েক টুকরা কলা খেতে পারেন।

তরমুজ

তরমুজ গ্রীষ্মকালীন ফল। গরমে প্রাণ জুড়াতে এই ফলের জুড়ি নেই। এতে পর্যাপ্ত পানি থাকে তাই শরীরে পানির ঘাটতি পূরণেও সাহায্য করে। পাশাপাশি দূর করে ইলেক্ট্রোলাইটের অভাব। এক ফালি তরমুজে থাকে প্রায় ১৭ গ্রাম চিনি। তরমুজ অতিরিক্ত খেলে তা রক্তে শর্করা বাড়িয়ে তোলে। তাই ডায়াবেটিসের সমস্যা থাকলে এই ফল কম খাওয়া উত্তম।

ডায়াবেটিসের রোগীরা কোন ফল খাবেন?

এখন রসাল ফলের মৌসুম। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, আনারস ইত্যাদি ফলের সমারোহ বাজারে। কিন্তু ডায়াবেটিসের রোগীরা এসব প্রাণভরে খেতে পারেন না, রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার ভয়ে। আসলেই কি তাঁদের জন্য সব ধরনের ফল নিষিদ্ধ?

কোন খাবারে রক্তে শর্করা কতটা বাড়ে, তা নির্ভর করে তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এবং গ্লাইসেমিক লোডের ওপর। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৭০-এর বেশি হলে তা উচ্চ মাত্রা, ৫৫-এর নিচে হলে কম মাত্রার। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যত উচ্চ, তা রক্তে শর্করা তত বেশি বাড়ায়। আবার গ্লাইসেমিক লোড ২০-এর বেশি হলে তা উচ্চ, ১১-এর নিচে কম। তাহলে দেখা যাক, আমাদের মৌসুমি ফলগুলোতে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ও গ্লাইসেমিক লোড কোনটাতে কী মাত্রায় আছে।

আমের গ্লাইসেমিক লোড ১২০ গ্রামে ৮-এর মতো। আর জাতভেদে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ভিন্ন, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৫৫ থেকে ৬০-এর মধ্যে। অর্থাৎ আম মাঝারি মাত্রার মধ্যে পড়ে। আমে প্রচুর আঁশ থাকার কারণে মিষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এটি দ্রুত শর্করা বাড়ায় না। তারপরও হিসাব করে খেতে হবে। তবে খেজুরের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স উচ্চ মাত্রার আর লোডও বেশি, ১৮। খেজুর তাই দিনের শেষে একটার বেশি খাওয়া ঠিক হবে না।

তবে খেজুর লৌহ ও অন্যান্য খনিজের চমৎকার উৎস। রমজানে একটি বা দুটি খেজুরই অনেক শক্তি জোগায়। তরমুজেরও গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি, ৭০-এর ওপর। কিন্তু এতে আছে প্রচুর জলীয় অংশ, যা গ্রীষ্মে মানবদেহের পানিশূন্যতা পূরণ করে। আনারসও মাঝারি মাত্রার—এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৫৬। কাঁঠাল বেশ ভালোই শর্করা বাড়াতে পারে; এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৬৮-এর ওপর। তবে কাঁঠালেও আছে অনেক আঁশ।

বেশির ভাগ ফলমূলে শর্করা ছাড়াও অতি প্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, খনিজ ও আঁশ রয়েছে। তাই খাবারের তালিকা থেকে ফল বাদ দেওয়া ঠিক নয়। তবে অন্যান্য যেকোনো শর্করা খাবারের মতো ডায়াবেটিসের রোগীদের ফলমূলও খেতে হবে নির্দিষ্ট মাত্রায়, নির্দিষ্ট সময়ে। ফলের মৌসুমে ফল খেতে চাইলে প্রয়োজনে অন্যান্য শর্করা (যেমন ভাত) কমিয়ে দিন। ভাত বা মূল খাবার গ্রহণের পরপরই ফল না খেয়ে অন্য সময়ে খান, অর্থাৎ শর্করা গ্রহণের সময়টা সারা দিনে ভাগ করে নিন। একই সঙ্গে একাধিক ফল অনেক পরিমাণে খাবেন না।
ডা. তানজিনা হোসেন. হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published.